একটা ডে প্যাক নিয়ে ডেজার্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। পানি-টানি আর আনুষঙ্গিক যা যা লাগতে পারে রাতে থাকার জন্য – সেসব নিয়ে নিলাম। জয়সালমির মেইন টাউনটা ছোট; ১০ মিনিট পরই আমরা শহরের সীমানা ছেড়ে গেলাম। এরপর আশেপাশে বিরান ল্যান্ডস্কেপ। ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ আর বুনোফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেই সাথে আছে বিশাল বিশাল উইন্ডমিল বসানো। প্রকৃতির রুক্ষতার মাঝেও মানুষের প্রয়োজন মেটানোর সামগ্রী।

শীতকাল থাকায় রাজস্থানের ত্বক পোড়ানো তাপমাত্রা পাই নি। তবে তীব্র রোদ ছিল। ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে বের করে নিলাম গড় তাপমাত্রা ২০-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাঝে। বেশ আরামদায়ক পরিবেশেই আমরা চললাম ধূলিধূসরিত প্রান্তরের বুক চিড়ে।

প্রায় ২০ কিমি দূরে যেতে এক জায়গায় এসে নরেন্দ্রজী আমাদের নামতে বললেন। জানালেন সেটা একটা পরিত্যক্ত গ্রাম, নাম কূলধারা। এয়ারটেলে প্রতিদিন এক জিবি নেট প্যাকেজ নেয়া ছিল, তাই নেট অ্যাক্সেস করার কোন সমস্যাই ছিল না। এক ক্লিকে বের করে ফেললাম কূলধারা গ্রামের ইতিহাস। কেন এই গ্রামের প্রতিটা মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে সেই বৃত্তান্ত।

তের শতকের প্রথম দিকে গড়ে ওঠা গ্রামটি কেন পরিত্যক্ত হল সে বিষয়ে শোনা যায়, শাসক সালিম সিং-এর অতিরিক্ত করারোপ এবং অত্যাচারে গ্রামবাসী অন্য জায়গায় শিফট করে। আবার গবেষকরা বলছেন, এমন কিছু নয়। ভূমিকম্পের কারণেই অধিবাসী সকলে এই গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো। ২০১০ সাল থেকে একে ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।[Ref: https://en.wikipedia.org/wiki/Kuldhara]

কূলধারা ঘুরে দেখতে বেশ ভালো লাগলো। ব্যক্তিগতভাবে এরকম “haunted place”-এর প্রতি এমনিই এক ধরণের দুর্বলতা আছে। পিংক ফ্লয়েডের Marooned ট্র্যাকটার মিউজিক ভিডিওর কথা মনে হচ্ছিলো। আধ ঘণ্টার মত সেখানে থেকে আমরা ফিরে এলাম গাড়ির কাছে। এবার সোজা যাবো উটের কাছে।

আরও ১৫-২০ মিনিট গাড়ি চালানোর পর উটের কাছে পৌঁছে জানতে পারলাম এখন দেড় ঘণ্টা ক্যামেল সাফারি হবে। আমরা যেখানে থাকবো, সেই ডিউন পর্যন্ত আর গাড়ি যাবে না। উটে চড়ে যাবো, এবং উটে চড়ে ফিরে আসবো। উট প্রস্তুত করা হচ্ছিলো, এর মাঝে আমরা একটু এদিক সেদিক দেখার চেষ্টা করলাম।

এখানকার মানুষ মাড়োয়ারি ভাষায় কথা বলেন। একটা উটের নাম জানতে চাইলাম, জানলাম তার নাম রোমিও। বেশ মজা পেলাম। এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ৩-টা উটের নাম জানলাম ম্যাঙ্গো, পাইনঅ্যাপল আর অরেঞ্জ। পিছে পিছেই আসবে আরেকজন, তার নাম মি. ইন্ডিয়া। সব ঠিক করা হলে বসে পড়লাম একটা উটের উপর।

সত্যি কথা বলতে প্রথমে নতুন অভিজ্ঞতা হিসাবে ভালো লাগলেও কিছুদূর যাওয়ার পর থেকে আর একেবারেই ভালো লাগছিলো না। চারটা উটকে আক্ষরিক অর্থেই নাকে দড়ি দিয়ে লাইন ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। এভাবেই যাওয়া হয় সবসময় নিশ্চয়ই। মনে হল, বেচারা কথা না বলা প্রাণিদের নিয়ে মানুষ কি বুদ্ধি বের করেছে আবার এখান থেকে অর্থ উপার্জনেরও ব্যবস্থা করছে। আমার স্বাস্থ্য ভালো বিধায় আরও বেশি করে মনে হচ্ছিলো এটা প্রাণিটার উপর অত্যাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নামা এবং হাঁটাও আরেক বিশাল সমস্যা। এটা একবার যিনি চড়েছেন তিনি হয়তো বুঝতে পারবেন। তাই কোনমতে সহ্য করে স্যান্ড ডিউনে যেয়ে নামার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পথিমধ্যে মরুভূমির যে দৃশ্য দেখলাম তা অদ্ভুত। কিছুদূর পরপর বড় কাঁটাগাছের মত উদ্ভিদ। হুট করে সামনে পড়ে যাওয়া সরু হাইওয়ে। কোন গাড়ি নেই। তুষার দেখে মানুষ আপ্লুত হয়, মরুভূমি দেখে হওয়ার কথা একটু চিন্তাশীল। এত বিরান, এত নির্জন যে খানিক ভয় লাগবে আবার দারুণ রোমাঞ্চকর লাগবে। পরিবার পরিচিতজন ছেড়ে ২৫০০ কিমি দূরে এমন বিরানভূমিতে চলে আসার অনুভূতি খুবই অদ্ভুত। এই থর মরুভূমি পার হলেই পাকিস্তান সীমান্ত।

তো যাই হোক, পৌঁছে আমরা উঁচু একটা ঢিবির উপর বসে সূর্যাস্ত দেখার অপেক্ষা করতে থাকলাম। সামান্য দূরে নরেন্দ্রজী, আর আরও ২ জন স্থানীয় মানুষ মিলে চুলা বানালেন, আমাদের রাতে থাকার ব্যবস্থা করতে শুরু করলেন এবং কিছুক্ষণ পর আমাদের হালকা ভাজাভুজি এবং চা এনে দিলেন। চাদর বিছিয়ে আমাদের বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেখানে বসে আমরা দেখতে থাকলাম অতি নির্জন সন্ধ্যা নেমে আসা – এই বিরানভূমির ওপরে। দূর থেকে ভেসে আসা কিছু মাড়োয়ারি ভাষার কথোপকথন আর হাসি ছাড়া যেখানে দুই চোখের সীমানায় মানুষের আর কোন চিহ্ন নেই।

[৫-টির বেশি ছবি যোগ করা যায় না, আরও কিছু ছবি পরের পর্বে যোগ করে দেয়ার চেষ্টা করবো।] [ভ্রমণ আমাদের মানুষ হিসাবে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করার কথা, আর যেখানে যেখানে বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদি ফেলে আসা কোন সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। যেখানেই যাবেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। আপনিসহ ভালো থাকবে আনুষঙ্গিক সকলে। ধন্যবাদ।]