থর মরুভূমির উপর সন্ধ্যা নেমে এলো। তাপমাত্রা দ্রুত নেমে আসতে থাকলো। সাধারণত যারা ডেজার্ট ক্যাম্পে যান, তারা তাঁবুতে থাকেন, কালচারাল প্রোগ্রাম দেখেন। আমাদেরটা অমন কিছু ছিলো না। হয়তো কালচারাল প্রোগ্রামের ভাইবটা মিস করেছি, কিন্তু যেই অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটা “out of the world” বলা যায়।

ডিউনের উঁচু জায়গাটায় অল্প নেটওয়ার্ক ছিলো, নিচে আসতে আসতে একদম শূন্য। আরও কিছুক্ষণ বসে এবং ফটোগ্রাফার বন্ধুর নানা ধরণের এক্সপেরিমেন্টে সাহায্য করে আমরা নিচের দিকে থাকার জায়গার আশেপাশে চলে এলাম।

এর মাঝে রাতের খাবার রান্না হয়ে গেছে। স্থানীয় রান্না। খুবই সাধারণ কিন্তু অতি সুস্বাদু খাবার। ভাত, রুটি, আলু-কপি, এক ধরণের ডাল – এই জিনিসের মধ্যে ঘরের খাবারের স্বাদ পাওয়া গেলো যেটা কিনা সমগ্র রাজস্থান জুড়েই মিস করেছি। উনারা আমাদের বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা। ভাষাগত দূরত্ব থাকার পরও আমাদের সাথে গল্প করার চেষ্টা করছিলেন।

বৃদ্ধ এক পাগড়ি পড়া স্থানীয় রাজস্থানি ভদ্রলোক বসে ছিলেন, উটগুলির মালিক সম্ভবত তিনি। তাঁর মুখে জানা গেলো, আমাদের আগে ১০ বছর আগে শেষ এক বাংলাদেশি পরিবার গিয়েছিলো। থাকার ব্যবস্থা দেখে খুব হইচই করেছিলো। আমরা শুনে হাসলাম। বললাম, আমরা স্টুডেন্ট মানুষ, সেইসাথে অ্যাডভেঞ্চার করতেই এসেছি। আমাদের অন্য কোন ধরণের কিছু লাগবে না। বরং এই যে উনারা এই মরুভূমিতে দিনে অতি গরম আর রাতে অতি ঠাণ্ডায় কীভাবে সারভাইভ করেন সেটা ফার্স্ট হ্যান্ড দেখতে পাচ্ছি, ইনস্ট্যান্ট তাদের রান্না করা লোকাল খাবারদাবার খাচ্ছি, গল্প করছি – এটাই আমাদের প্রয়োজন।

এরপর উনারা জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কখন ঘুমাবো, যেহেতু আমরা ঘুমালে উনারাও ঘুমাতে যেতে পারেন। রাত মাত্র ৮ঃ৩০- টা। আমরা বললাম, এইতো কিছুক্ষণ পরই, আপনারা ঘুমিয়ে পড়ুন। এই পর্যায়ে থাকার জায়গার একটু বিবরণ দেই, ভয় পাবেন না।
রাতে যাতে বাতাস না আসে, সেজন্য খড় পাতা এরকম কিছু দিয়ে একটা ব্যারিয়ার দেয়া হয়েছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে বা ডিসকভারি চ্যানেলে এরকম দেখেছি।
তার সামনে স্রেফ কয়েক স্তরের তোষক বিছানো এবং গায়ে দেয়ার জন্য কয়েক স্তরের লেপ।
একটা করে বালিশ।

আমাদের জন্য এক পাশে, উনাদের নিজেদের জন্য আরেক পাশে।

উনারা ঘুমিয়ে পড়লেন। আমার সঙ্গীরা ঘুমিয়ে পড়লো।

সারা গায়ে লেপ জড়িয়ে বড় বড় চোখ করে জেগে থাকলাম আমি। আমার বালিশের নিচে মোবাইল, সাইড ব্যাগে যাবতীয় টাকাপয়সা। ভয় লাগছে, কিন্তু অভাবনীয় পর্যায়ের ভালো লাগছে। অভাবনীয় প্রিমিটিভনেস। ঠিক আমার বিছানার পাশে শীতে গুঁটিসুটি হয়ে শুয়ে ছিলো দু’টা রুগ্ন ভেজিটারিয়ান কুকুর। ভেজিটারিয়ান বলছি কারণ বেচারাদের আশেপাশে কোথাও মাংসের সন্ধান মেলার কথা না। রাজস্থান যথেষ্ট স্ট্রিক্টলি ভেজিটারিয়ান। 

তো যাই হোক, আপনি শহর থেকে দূরে একটু নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাতে চাইতে পারেন, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝর্নার কাছে যেতে পারেন। কিন্তু ন্যুনতম বিলাসবর্জিত এই জীবনের আস্বাদ পাওয়া সহজ নয়। যারা আছেন তারা যদি ভালো লোক না হতেন, আমাদের কিছুই করার থাকতো না। কয়েক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মাঝে সাহায্য চাওয়ার কেউ ছিল না হয়তো। জোরে ডাকলে শুনবে এমন কেউ নেই। আছেন শুধু আপনি, কিছু রুগ্ন অবলা প্রাণি, মানব সভ্যতার অনেক দূরে শুধু কিছু প্রাকৃতিকভাবে বাঁচার উপায় আর মাথার উপর লক্ষাধিক তারার আকাশ।

আপনাদের টাইটানিক মুভির দৃশ্যটার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই- কেট উইন্সলেট কাঠের দরজাটার উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শেষ রাতে আস্তে আস্তে গুনগুন করার চেষ্টা করছিলো? সেটার সাথে খানিকটা রিলেট করতে পারেন। লেপের ভেতর থেকে শুধু নাক বের করে আমি দীর্ঘ রাত জেগে থাকার চেষ্টা করছি; ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না কারণ এই অদেখাকে আর কোনদিন দেখা হবে না। ঘুমিয়ে পড়লে এই অচেনাকে আর চেনা হবে না।

রাত ১২-টার দিকে আমার ঠিক এক হাত দূরে আমাদের দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করে দু’টা কুকুর ঝগড়া শুরু করলো। ইভেনচুয়ালি থেমেও গেলো। আড়াই হাজার কিলোমিটার দুরের দেশে রেখে আসা আপনজনদের কথা মনে করে, মনে সামান্য ভয়, কাতরতা এবং একরাশ ভাষাহীন ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে কোন এক সময় আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।

[ছবি তোলায় আমি অত্যন্ত অদক্ষ, লিখতে চেষ্টা করছি কেবল। আমার কাছে বেটার ছবি নেইও, তাই ঠিক ছবির অনুভূতিতে আপনাদের নিয়ে যেতে পারলাম না।

বেসিক দরকারি তথ্য পরের পর্বে দিতে চেষ্টা করবো। এই পর্বে আপাতত শুধু এটুকুর বর্ণনা থাক। কারো কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকলে জানাবেন, সাহায্য করতে চেষ্টা করবো।] [ভ্রমণ আমাদের মানুষ হিসাবে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করার কথা, আর যেখানে যেখানে বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদি ফেলে আসা কোন সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। যেখানেই যাবেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। আপনিসহ ভালো থাকবে আনুষঙ্গিক সকলে। ধন্যবাদ।]