#সোনালি_প্রান্তরে (জয়সালমির বৃত্তান্ত)

[পর্ব ১]

গত ডিসেম্বরে রাজস্থান দেখার কথা ছিল শিমলা-মানালি দেখার পর। ঘটনাচক্রে শিমলা-মানালি আমাদের দেখা হল না, কিন্তু শাপে বর হিসাবে বরঞ্চ কোনরকম তাড়াহুড়ো ছাড়া রাজস্থান ঘুরে দেখলাম।

আমাদের রুট ছিলো ঢাকা- কলকাতা- আগ্রা- জয়পুর- আজমির- পুষ্কর- উদয়পুর- জয়সালমির- দিল্লি- কলকাতা- ঢাকা। একেক আমেজের একেক শহর। আমরা যতজন ছিলাম, বারবার এই বিষয়ে একমত হয়েছি যে, রাজস্থানের আসল আমেজ বা সৌন্দর্য আসলে ছবিতে আনা সম্ভব না। কারণ এটা তো ঠিক scenic beauty-র জায়গা না। এখানকার মানুষ, এই কঠিন রোদে পুড়ে জ্বলে যাওয়া মানুষগুলির অতিথিপরায়নতা এবং হাসিমুখ, এই রুক্ষতার এত বর্ণিল রঙ, রাতে সারা শহরের চোখ জুড়ানো লাইটিং – এসব অনুভব করার জন্য আপনাকে সেখানে সশরীরে যেতে হবে। হেঁটে দেখতে হবে, কথা বলে দেখতে হবে।

সম্পূর্ণ ভ্রমণ নিয়ে একবারে লেখা তো কখনই সম্ভব না। একেক শহরের গল্প একেক রকম। আজ নেহাতই খানিক ঝড়বৃষ্টির মাঝে জয়সালমির নিয়ে নস্টালজিক হয়ে গেলাম, কারণ মাথায় ঘুরছিলো মালাকে নিয়ে লেখা প্রিয় অঞ্জন দত্তের লাইন, “বৃষ্টি এলে চলে যাও জয়সালমির”। তো ভাবলাম একটু লেখার চেষ্টা করা যাক। আজ না হলে আর কখনই নয়।

আমরা ২ জানুয়ারি রাতে রওনা দিয়ে ৩ জানুয়ারি সকালে জয়সালমির আসি।
উদয়পুর থেকে ওভারনাইট ১২ ঘণ্টার বাস জার্নি।
এসি বাস, স্লিপার কোচ। স্লিপার মানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের স্লিপার না, একদম আরামে শুয়ে ঘুমানোর মত স্লিপার।
ভাড়াঃ ১৫০০ রুপি, রাজ পরিবহন।
রাত সাড়ে ৮ টায় রওনা, সকাল সাড়ে ৮ টায় পৌঁছানো।
টিকেট কাটা হয়েছিলো আগের দিন উদয়পুরের সরকারি বাসস্ট্যান্ড থেকে।

সকালে নেমেই পেলাম ট্যাক্সিওয়ালাদের খুব তোড়জোড়, বাবু যাবেন? কষ্টেসৃষ্টে করা স্পষ্ট উচ্চারণ। জয়সালমিরে কোন এক কারণে বাঙালি অনেক কিংবা বাংলা ভাষা যথেষ্ট পরিচিত। তো আমরা আগের দিনই Airbnb অ্যাপ থেকে Hostel Fortside বুক করে গেছিলাম। বাসস্ট্যান্ড থেকে সেখানে একটা ট্যাক্সি ধরে ১০ মিনিটের পথ ২০ রুপিতে গেলাম। ১০০ রুপি চেয়েছিলেন, তবে আমরা যাতে পরদিন উনার সাথে ডেজার্ট সাফারিতে যাই, সেই উদ্দেশ্যে ছাড় দিয়েছিলেন। 

সেটা আর যাই নি। 

হোস্টেলে পৌঁছে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। চমৎকার ট্রাভেলিং ভাইব ছড়ানো অ্যামবিয়েন্স। কমন ডাইনিং-এ অপেক্ষা করতে করতে দেখি একদল কোরিয়ান ট্রাভেলারের সাথে আমার সঙ্গীদের কি একটা খাতির হয়ে গেলো। পেলাম ওয়েলকামিং কমপ্লিমেন্টারি চা। এর মাঝে টেম্পোরারি একটা রুম ছেড়ে দিয়ে হোস্টেলের ম্যানেজার আলাদিন আমাদের তিন বিধ্বস্ত প্রাণিকে ফ্রেশ হয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। তার মাধ্যমেই আমরা একটা ডেজার্ট সাফারির প্যাকেজ নিলাম।
৩ ডিসেম্বর দুপুর ২-টা থেকে ৪ ডিসেম্বর সকাল ১১-টা পর্যন্ত।
থর মরুভূমিতে থাকা, বিকালের নাস্তা, রাতের খাবার এবং সকালের নাস্তা ইনক্লুডেড।
পার পার্সন ১৫০০ রুপি।[প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ডেজার্ট সাফারির প্যাকেজ কোন মালিকপক্ষের মাধ্যমে না নিয়ে সরাসরি জিপের ড্রাইভারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আমাদের জিপের ড্রাইভার নরেন্দ্র সিং এতটাই আন্তরিক এবং chill mood-এর মানুষ ছিলেন যে তাঁর সাথে বেড়ানোটা ভালো তো হয়েছিলোই, সেইসাথে উনার সাথে আমাদের এখনো যোগাযোগ আছে। সরাসরি যোগাযোগের নম্বর চাইলে দেয়া যাবে।]

সেদিন রাতে যেহেতু আমরা হোস্টেলে থাকবো না, মরুভূমিতে থাকবো, তাই দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন ছিলো। অতঃপর হোস্টেলের গ্রাউন্ডে ভারী ব্যাগেজ জমা রেখে আমরা এই ছোট্ট শহরটা একটু পায়ে হেঁটে দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের হোস্টেল থেকে জয়সালমির ফোর্ট (the only living fort in India), সত্যজিৎ রায়ের সুবাদে যা সোনার কেল্লা নামে অতি বিখ্যাত, ছিলো ৫ মিনিটের দূরত্বে। ফোর্টের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম পাকওয়ান রেস্টুরেন্ট। সেখানে চাওমিন আর চা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। রুফটপ থেকে প্যানারমিকভাবে যেদিকেই তাকাই সেদিকেই এত সোনালি রঙ দেখতে অভূতপূর্ব আনন্দ হচ্ছিলো। আর কিছুদূর হেঁটে ঘুরেফিরে ২-টা বাজে আমরা হোস্টেলের সামনে ফিরে এলাম।এর মধ্যে জিপ চলে এসেছে। আমরা রওনা দিলাম ডেজার্ট সাফারির পথে। ভাবতে পারি নি কতটা অসাধারণ অনুভূতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সেই গল্প পরের পর্বে করার চেষ্টা করবো। আজ এর মাঝেই অনেক দীর্ঘায়িত হয়ে গেছে।

[ভ্রমণ আমাদের মানুষ হিসাবে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করার কথা, আর যেখানে যেখানে বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদি ফেলে আসা কোন সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। যেখানেই যাবেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। আপনিসহ ভালো থাকবে আনুষঙ্গিক সকলে। ধন্যবাদ।]