দুইপাশে বিশাল পাহাড় আর তার মধ্য দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা জলধারা আর সেই জলধারা থেকে তৈরি হওয়া অসাধারন মোহনীয় জলপ্রপাত আমিয়াখুম। ভ্রমনপ্রেমীদের কাছে আমিয়াখুম Once in a lifetime experience এর মত, জীবনে একবার হলেও কাছ থেকে দেখতে চায় সৃষ্টিকর্তার অপরুপ এই সৃষ্টিকে। কোন কিছু অর্জনের জন্য অনেক সময় সামর্থের সবটুকু উজার করে দিতে হয়। আমিয়াখুম জয়েও তেমন সামর্থের পরিচয় দিতে হয়। তবে যারা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সেই অসাধ্য সাধন করবেন, তাদের মনের গহীনে আজীবন গেথে থাকবে সেই স্মৃতি । বর্ষায় যখন যৌবন ফিরে পায় তখন আমিয়াখুম জলপ্রপাত আরো ভয়ংকর আর সুন্দর হয়ে উঠে।

আমিয়াখুম যাওয়ার জন্য প্রথমেই চলে আসুন বান্দরবানে।
–প্রথমদিন সকালে বান্দরবান থেকে রিজার্ভ চাদের গাড়ি অথবা থানচিগামী বাসে চলে আসবেন থানচিতে৷ থানচিতে একজন গাইড সহ পুলিশ ও বিজিবি ক্যাম্পে নাম নিবন্ধন করে নিবেন আইডি কার্ডের ফটোকপি সহ। অনেক সময় হুটহাট র‍্যুট বন্ধ করে দেয়া হয় বিভিন্ন নিরাপত্তা সংকটে।তাই যাওয়ার আগে খোজ নিয়ে যাওয়াই উত্তম। থানচি থেকে দুই ভাবে আমিয়াখুম যেতে পারবেন। অপেক্ষাকৃত কম কষ্টে নৌকায় রেমাক্রি হয়ে ২.৫-৩ ঘন্টার ট্রেকিং করে নাফাখুম এবং সেখানে থেকে আরো ২.৫-৩ ঘন্টার ট্রেকিং এ জিন্নাপাড়া অথবা থুইসাপাড়া হয়ে পরেরদিন আমিয়াখুম। অথবা ২য় উপায়, নৌকায় পদ্মঝিরি থেকে ৮-১০ ঘন্টা ট্রেকিং করে হরিশ্চন্দ্র পাড়া হয়ে থুইসা পাড়া রাতে থাকা এবং পরেরদিন আমিয়াখুম।
–২য় দিন পাড়া থেকে গাইড নিয়ে রওনা দিবেন দেবতা পাহাড় হয়ে আমিয়াখুমের পথে৷ বর্ষাকালে দেবতা পাহাড়ে উঠতে যত কষ্ট তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক অপরপাশে খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামা। ট্রেকিং এর উপর নির্ভর করে ২-৩ ঘন্টার মধ্যে পৌছে যাবেন আমিয়াখুম। সাথে বোনাস হিসেবে পাবেন ভেলাখুম, নাইক্ষ্যং ঝিরি। এত কষ্টের পর যখন লক্ষ্যে পৌছাবেন তখন আমিয়াখুমের অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে ভূলে যাবেন সব কষ্ট।
–৩য় দিন পুনরায় ট্রেকিং করে নাফাখুম হয়ে রেমাক্রি। সেখান থেকে নৌকায় থানচি এবং থানচি থেকে রিজার্ভ চাদের গাড়ি বা বাসে বান্দরবান হয়ে ফিরে যাবেন আপনার গন্তব্যে ।

***যদি শরীরে সামর্থ এবং মনে প্রবল জোর থাকে শুধুমাত্র তাহলেই পদ্মঝিরি হয়ে ট্রেকিং এর সিধান্ত নিবেন নাহলে নিজের জীবন সংকাটপ্নন করে অন্যের জন্য বোঝা না হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এমন অনেককে পাবেন যারা প্রথমদিনের ট্রেকিং এর ধকল সইতে না পেরে ২য় দিন আমিয়াখুম যেতেই পারে নি। তাই যারা ট্রেকিং এ খুব বেশি অভ্যস্ত না তারা নাফাখুম পর্যন্ত সহজেই ঘুরে যেতে পারেন।
*বর্ষায় জোকের প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়, তবে ভয় পাবেন না। নিজে না পারলে জোক ছাড়াতে অন্যদের সাহায্য নিন, সাথে লবন রাখতে পারেন কাজে দিবে।
*সাথে ফার্স্ট এইড কিট রাখতে পারেন।
*বান্দরবানের গহীনে বিদ্যুতের কোন ব্যবস্থা নেই, তাই সাথে পাওয়ার ব্যাংক ও ক্যামেরার জন্য এক্সট্রা ব্যাটারি নিয়ে যাবেন।
*থানচি থেকে কিছুদূর এগোলেই মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, তবে থুইসাপাড়ায় উপজাতীয়দের তৈরি নির্দিষ্ট বাশের টাওয়ারের উপর রেখে ফোনে ক্ষেত্রবিশেষে নেটওয়ার্ক পেতে পারেন। বাটন ফোন আর এয়ারটেল/রবি সিম এক্ষেত্রে ভাল কাজে দেয়।
**উপজাতীয়দের সাথে ভাল ব্যবহার করুন।
** জিন্নাপাড়া এবং থুইসা পাড়ার কাছে বিজিবি ক্যাম্প আছে। রাতে হৈ হুল্লুড়, বাহিরে উচ্চস্বরে গান বাজনা থেকে বিরত থাকুন।
***বর্ষায় দেবতা পাহাড় বেয়ে নিচে নামার পথ অনেক বিপজ্জনক তাই গাইড কে বলবেন সাথে শক্ত মোটা দড়ি নিতে সাথে।
***পাহাড়ি জলপ্রপাতের নিচে গভীর খাদ থাকে তাই ভাল সাতার না জানলে এবং লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে লাফ দেয়া বিপজ্জনক।
**আমার ট্যুর আরো ১ বছর আগের, তখনকার খরচের সাথে এখনকার খরচের পার্থক্য আছে, বিশেষ করে চাদের গাড়ি ও নৌকা ভাড়া বেড়েছে। তাই খরচ উল্লেখ করলাম না। যাওয়ার আগে বতর্মান ভাড়ার খোজ নিয়ে যাওয়াই উত্তম।

***যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। আর চিপস, চকলেটের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন সহ অপচনশীল বর্জ্য ব্যাগে ভরে ফেরত নিয়ে এসে থানচিতে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।