বার্ডম্যান অফ চেন্নাই- সার্চ দিয়েছিলাম ‘চেন্নাইয়ের দর্শনীয় স্থান’ লিখে। কিন্তু ফলাফল দেখে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এটা কি কোন জায়গার নাম? নাকি কোন ব্যক্তির? কী আছে এখানে? চেন্নাইয়ের প্রচণ্ড গরমে প্রত্যেকবার বাইরে যাওয়ার আগে খানিকটা ভেবে নিতে হতো- যেখানে যাচ্ছি, তা আসলেই দেখার মতো তো? নাকি শুধু শুধু এই গরমে নিজেকে সিদ্ধ করা?
.
হাতে আছে পুরো একটি দিন। সারাদিন তো আর হোটেলে বসে কাটানো যায় না। তাই সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে সাড়ে তিনটার দিকে রওনা দিয়েই দিলাম। উবার ড্রাইভার একটি লন্ড্রির দোকানের সামনে কার থামিয়ে ইশারায় বোঝালো এটাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল। গোলাম আব্বাস আলী খান ফোর্থ স্ট্রীট থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পনেরো থেকে বিশ মিনিটের পথ। আমি লন্ড্রির দোকানে কর্মরত যুবককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বার্ডম্যান অফ চেন্নাই কোথায়?’ তিনি আঙ্গুল দিয়ে পাশের বাড়িটি দেখিয়ে দিলেন।
.
বাড়ির মূল দরজা দিয়ে উপরে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম, তিনতলার ছোট্ট বারান্দায় একজন ভদ্রলোক এক কিশোরীর হাতে একটি টিয়াপাখি বসিয়ে দিলেন। বুঝতে বাকি রইলো না ইনিই বার্ডম্যান অফ চেন্নাই।
আমরা তিনতলায় উঠতেই তিনি আমাদের স্বাগত জানিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছাদে কাঠের পাটাতন বসিয়ে সেখানে মুঠোভরে ভেজা চাল রাখতে লাগলেন। এর ফাঁকেই আধো হিন্দি, আধো ইংরেজিতে কথা হল বার্ডম্যান অফ চেন্নাইয়ের সঙ্গে। ভদ্রলোকের আসল নাম শেখর। পেশায় একজন ক্যামেরা টেকনিশিয়ান।
.
বছর পনেরো-বিশ আগের কথা। শেখরের বাসার ছাদে নিয়মিতই দেখা মিলতো দুইটি টিয়াপাখির। শেখর তাদের খাবার দিতেন। এরপর একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন তাদের সঙ্গে এসেছে আরো দুইটি টিয়া। তার পরবর্তী দিন এসেছে আরো চারটি। এভাবেই ধীরে ধীরে তার ছাদে বাড়তে লাগলো টিয়াপাখির ভীড়- যে সংখ্যাটা বর্তমানে গিয়ে ঠেকেছে প্রায় দু’হাজারে। এতে কোন বিরক্তি কিংবা ক্লান্তি নেই শেখরের। বরং পরম মমতা ও ভালোবাসায় তিনি রোজ বিকেলে কাঠের পাটাতনে চাল রেখে অপেক্ষা করেন টিয়াপাখির জন্য।
.
কাঠের পাটাতনে চাল দেওয়া শেষ হলে শেখর আমাদের নিয়ে গেলেন রাস্তার ওপাড়ের একটি বিল্ডিং এ। সেই বিল্ডিং এর চারতলায় দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম টিয়াপাখির জন্য। প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় হঠাৎ করে এক ঝাঁক টিয়াপাখি শেখরের বাসার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেলো। তার ঠিক কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শেখরের বাসার ওপরের নীল আকাশটা পরিণত হয়ে গেলো সবুজ রঙে। যেনো পুরো আকাশটা দখল করে নিলো টিয়াপাখির দল। শুধু কী আকাশ, কারেন্টের তারেও তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রইলো না। কী চমৎকার এক দৃশ্য! এরপর চারপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়াপাখি আসতেই থাকলো। থামার কোন নামগন্ধ নেই।
.
কথাবার্তায় অসম্ভব রকমের বিনয়ী এই মানুষটি দীর্ঘ পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই টিয়াপাখিদের খাবার দিয়ে আসছেন। একবার মনে হয়েছিল, তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘কেনো?’ কিন্তু পরক্ষণে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে বসলাম, ‘সব কেনো’র কি উত্তর থাকে?’
.
সুন্দর এই পৃথিবীকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। তাই যেখানেই ঘুরতে যাই না কেনো, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে আমরা কেউই পরিবেশকে দূষিত করবো না- এই কামনা।